ভাবসম্প্রসারণ |Bhabsomprosaron

যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি আশু গৃহে তার দেখিবে না আর নিশীথে প্রদীপ বাতি


মূলভাব : মনের ক্ষণস্থায়ী আনন্দের জন্য বিলাসিতা করে অর্থ-সম্পদ অপচয় করা উচিত নয়। অপচয় না করলে সাধারণত অভাবও হয় না। অপরের সাহায্য ছাড়াই দুর্দিনে দারিদ্র্যের মোকাবিলা করা যায়

 

সম্প্রসারিত ভাব : মানুষের অর্থ-সম্পদ সীমিত। আর সীমিত অর্থ-সম্পদ দিয়ে আমাদের অসীম অভাব পূরণ করতে হয়। যেমন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদি আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় অভাব। এসব অভাব দূর করতে না পারলে আমাদের জীবন চলতে পারে না। আবার কিছু অভাব আছে যেগুলো পূরণ না করেও আমরা চলতে পারি। যেমন বিলাসবহুল বাড়ি, গাড়ি, এসি, দামি পোশাক, দামি অলঙ্কার ইত্যাদি। কিন্তু যখন অর্থ-সম্পদ থাকে, তখন মানুষ ভবিষ্যতের চিন্তা না করে অপচয় করে। বিলাসিতা করে দিন কাটায়। বিলাসবহুল নিত্য নতুন জিনিসপত্র ক্রয় করে নিজের অর্থ-সম্পদ প্রদর্শনের জন্য। কিন্তু মানুষের জীবন সুখ সাফল্যে শেষ নাও হতে পারে। জীবনে নেমে আসতে পারে দারিদ্র্য, ব্যর্থতা। তখন সঞ্চিত অর্থ দিয়ে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি খোঁজা যায়। কিন্তু যদি কেউ সব অর্থ-সম্পদ বিলাসিতা করে নষ্ট করে তাহলে একদিন তাকে দিশেহারা হয়ে যেতে হয়। যে কিনা সারাজীবন বিলাস-বহুল জিনিসের পেছনে ছুটেছে, সে জীবনধারনের জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর অভাব মেটাতে ব্যর্থ হবে। তার জীবনে নেমে আসবে কেবল অভাব এবং দারিদ্র্য। বুদ্ধিমান সঞ্চয়ী মানুষ নিজের এবং পরিবারের কল্যাণে খারাপ সময় মোকাবিলার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সঞ্চিত রাখে

 

 

" কেরোসিন শিখা বলে মাটির প্রদীপে,
ভাই বলে ডাক যদি দেব গলা টিপে,
হেন কালে আকাশেতে উঠিলেন চাঁদা,
কেরোসিন শিখা বলে- “এসো মোর দাদা।

 

মূলভাব : বিত্তশালী মানুষদের প্রতি অনুরাগ এবং নিজের থেকে বিত্তহীন স্তরের মানুষদের প্রতি অবজ্ঞা, মানবসমাজের এক শ্রেণির মানুষের দুর্বল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য

সম্প্রসারিত ভাব : পৃথিবীতে মানব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য রহস্যময়। আমাদের এই সমাজে মানুষ সবসময় চেষ্টা করে সমাজের ওপরের স্তরের মানুষের সঙ্গে আত্মীয়তা স্হাপন করতে।নিজেদের নীচের তলার মানুষের দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না আত্মীয় হলেও তাকে উপেক্ষা করে চলে। মূলত মানুষ নিজের চেয়ে অবস্থানে ছোটোদের চরমভাবে অস্বীকার করে, আর বড়োদের তোষামদ করে আপন করে নিতে চায়। পদমর্যাদা সামাজিক অবস্থান মানুষকে অন্ধ করে দেয়। এর প্রলোভনে মানুষ নিজের আপন মানুষকে দূরে ঠেলে দিয়ে, দূরের মানুষকে আপন করার চেষ্টা করে। এতে করে সে তার নিজস্বতাকে হারিয়ে ফেলে, কিছুই অর্জন করতে পারে না

প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই প্রকৃতিতে আমরা আলো এবং অন্ধকারের উপস্থিতি দেখতে পাই। প্রতিনিয়ত যথা সময়ে দিনের শেষে পৃথিবী অন্ধকারের কালো চাঁদরে ঢেকে যায়। রাতের আঁধার কাটলে সকালে পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশ আবার সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়। প্রাকৃতিক নিয়মেই এমনটা ঘটে। দিনের স্নিগ্ধতা আর রাতের কোমলতা এসব কিছুকে সৃষ্টিকর্তার অফুরন্ত নিয়ামত হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। সুন্দর এই পৃথিবীতে পরস্পর বিপরীতধর্মী বিষয় বস্তুসমূহের মধ্যে তীব্র আকর্ষণ বিরাজ করে। এসব উপাদানের দ্বান্দ্বিক পালা বদল প্রক্রিয়া সর্বদা সচল এবং অস্তিত্বমান। জন্ম-মৃত্যু, সৃষ্টি-ধ্বংস, আলো-আঁধার, আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ এসব কিছুই পরস্পরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, যদিও বৈশিষ্ট্যগতভাবে এরা একে অপরের বিপরীত। সৃষ্টির প্রতিটি জীবের কাছে নিজের জীবন অমূল্য সম্পদ। জন্মের পর মৃত্যু অবধারিত বলেই বেঁচে থাকাটা এত মধুর।  মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে শুধুমাত্র তখনই সুস্থতার গুরুত্ব বুঝতে পারে। সেজন্যেই মানুষ তার সুস্বাস্থ্য রক্ষা করতে চায়। সুখ-দুঃখও তেমন বিপরীতধর্মী উপাদান বলে একে অপরের পরিপূরক। দুঃখ মানুষের মনকে যদি ব্যথিত করতে না পারতো তাহলে মানুষ সুখ আনন্দবোধের মর্ম বুঝতে পারতো না। সুখ লাভের আশায় মানুষ দুঃখ-কষ্টকে হাসিমুখে আলিঙ্গন করতে রাজি হয়। ঠিক একইভাবে প্রকৃতিতে অন্ধকারের উপস্থিতি আছে বলেই আলো এত মহিমাময়। অন্ধকার না থাকলে আলোর গৌরব এবং দীপ্তি এসব কিছুই ম্লান হয়ে যেত

 

" ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি "

 

মূলভাব : ক্ষুধার অনুভূতি তীব্র প্রচণ্ড। দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাত মানুষের দৃষ্টি হৃদয় থেকে রূপ-সৌন্দর্য প্রেমের নান্দনিক বোধগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। তাই ক্ষুধার নিবৃত্তি অত্যাবশ্যক

সম্প্রসারিত ভাব : মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সৌন্দর্যপ্রিয়, রূপপিয়াসী, কল্পনাবিলাসী। কল্পনার জগতে বিরাজ করতে করতে মন হারিয়ে যায় সুদূরে। বাঁশির সুর মনকে উদাস করে দেয়। বৃষ্টির রিমঝিম ধ্বনি অন্তরকে টেনে নিয়ে যায় দূরে, প্রিয়জনের সান্নিধ্যে। সবই মন হরিণীর লীলাখেলা। এগুলো মনকে তৃপ্ত করে, হৃদয়কে শান্ত করেপেট ভরা থাকলে চাঁদের হাসি আনন্দের বাঁধ ভেঙে দেয়, ফুলের সুবাস মাতোয়ারা করে হৃদয়, রঙের খেলা নানা রঙে রাঙিয়ে তোলে অন্তর। কিন্তু পেটে যদি খাবার না থাকে তাহলে পৃথিবীটাকে মনে হয় নিরস-গদ্যময়। ক্ষুধার তীব্রতায় যে কোনো গোলাকার জিনিসকে মনে হয় ঝলসানো রুটি। অর্থাৎ ক্ষুধাই সেখানে মুখ্য, অন্য সবকিছুই গৌণ, তুচ্ছ, গুরুত্বহীন। তাই ক্ষুধিতের কাছে পুর্ণিমার চাঁদ ঝলসানো রুটি হিসেবে ধরা দেয়। চাঁদের সৌন্দর্যে ক্ষুধিত কিছুমাত্র আকর্ষণ বোধ করে না। জীবনের সব ভালোলাগা, সব রূপ, সব ছন্দ হারিয়ে যায়। সময় জীবন হয়ে ওঠে বিবর্ণ, শুষ্ক, ধুলিধূসর।
সভ্যতার উৎকর্ষের যুগেও পৃথিবীর চল্লিশ শতাংশ মানুষ এখনও মানবেতর জীবন যাপন করে। তাদের চারপাশে কেবল অভাব-অনটন, ক্ষুধা-তৃষ্ণা সমস্যার পাহাড়। কষ্ট আর যন্ত্রণায় তাদের মন থেকে রূপ-সৌন্দর্যবোধ হারিয়ে গেছে।মানব জীবনের প্রথম চাহিদা ক্ষুধার নিবৃত্তি। তা দুষ্প্রাপ্য হলে কাব্যের ছন্দ, অলংকার, উপমা পানসে হয়ে যায়। পূর্ণিমার চাঁদকে মনে হয় ঝলসানো রুটি। তাই মানব জীবনে ক্ষুধা নিবৃত্তির সাধনাই হোক আমাদের প্রথম সাধনা

 

প্রাচীরের ছিদ্রে এক নাম গোত্র হীন  ফুটিয়াছে ফুল এক অতিশয় দীন।
ধিক্ ধিক্ বলে তারে কাননে সবাই,
সূর্য উঠি বলে তারে ভালো আছো ভাই?

 

মূলভাব : ক্ষুদ্রের গৌরব ক্ষুদ্র মানুষেরা স্বীকার করে না।করেন মহৎ ব্যক্তিরা। প্রাচীরের ছিদ্রে ফোটা এক নাম গোত্রহীন ফুলকে বাগানের ফুলেরা স্বীকার না করলেও, তাকে স্বীকৃতি জানায় স্বয়ং সূর্য।এখানেই প্রকৃত মহত্ত্বের পরিচয়

সম্প্রসারিত ভাব : নিজ জন্মের ওপর মানুষের কোনো হাত নেই। সে সমাজের একেবারে নিম্ন স্তরে জন্মগ্রহণ করতে পারে আবার সমাজের উঁচু স্তরেও জন্ম গ্রহণ করতে পারে। তেমনি ভাঙ্গা প্রাচীরের গায়ে এক অখ্যাত ফুল ফুটেছে যার আকার ছোট, রঙের কোনো বাহার নেই, নেই কোনো গন্ধ, নেই শোভা। তার স্বজাতি ফুলগুলোও তাকে পরিচয় দিতে নারাজ। এমন কি সে ছোট বলে তার কোনো নাম নেই বলে তাকে ধিক্কার জানাতে দ্বিধাবোধ করে না। কিন্তু সেই অবহেলিত ফুলকে সূর্য প্রতিদিন সম্মান জানিয়ে মহত্ত্বের পরিচয় দিয়েছে। আমাদের সমাজে এমন অনেক ব্যক্তি আছেন যারা ধন সম্পদের অঢেল মালিক, তাদেরকে সবাই শ্রদ্ধা করে, সম্মান করে। অথচ তারাই সমাজের নিরীহ গরিবদের মানুষ হিসেবে মনে করে না। কিন্তু তারা ভাবে না যে সমাজের সে স্তর থেকেও যে তারা বড়ো কিছু হতে পারে। তারপরও সমাজে সব মানুষ সমান নয়। যারা প্রকৃত মহৎ এবং উদার তাদের মন সবসময় সুন্দরের আলোয় আলোকিত। তাদের চোখে সমাজে ছোট বড় বলে কিছুই নেই। সকলকেই তারা সমানভাবে মূল্যায়ন করে। সূর্যের মতোই তাঁরা মহৎ এবং উদার। সূর্য যেমন অখ্যাত ফুলকে সবসময় কুশল জানায় তেমনি সমাজের মহৎ ব্যক্তিবর্গ নিরীহ গরিবদের পাশে থাকে। তাদের যেকোনো প্রয়োজনে মহৎ ব্যক্তিগণ এগিয়ে আসেন। এই উদারতার আলোকেই তারা সমাজের সবাইকে সমানভাবে মর্যাদা দিয়ে থাকেন। সমাজে যাঁরা প্রকৃত উদার মনের অধিকারী তারা ধনী-গরিব সবাইকে সমানভাবে মূল্যায়ন করেন। কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরন থেকে তারা বিরত থাকে

 

বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে

 

মূলভাব : নিজের নিজের পরিবেশে সব কিছুই সুন্দর মাতৃক্রোড়ে শিশুকে এবং বন্যপশুকে বনে দেখতেই ভালো। পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হলেই তা অসুন্দর এবং বিসদৃশ

সম্প্রসারিত ভাব : প্রত্যেক প্রাণীই একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে জন্ম গ্রহণ করে। সেই পরিবেশেই সে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। আপন পরিবেশের সাথে তার এক ধরণের সম্পর্ক গড়ে উঠে সেখানেই তাকে সবচেয়ে ভালো মানায়। প্রতিটি প্রাণীই আপন পরিবেশ ছাড়া চলতে পারে না। বন্য প্রাণীর জন্য সুন্দর স্থান হলো বনভূমি। বন্য প্রাণীরা মানুষের সাথে বসবাস করতে পারবে না। নিজস্ব পরিবেশই তাদের সুখ দিতে পারে। বনের পাখিদের বৈশিষ্ট্য হলো আকাশে উড়ে বেড়ানো। সেই পাখিকে দামী খাঁচায় ভরে রাখলেও সে আনন্দ পাবে না। আবার শিশুদের জন্য মায়ের কোলই হলো উপযুক্ত স্থান। মায়ের কোল ছাড়া অন্য কারো কোলে রাখলে সে তৃপ্তি পায় না।  জলের পরিবেশেই মাছের বৃদ্ধি, জল থেকে ডাঙ্গায় তুললে মাছ মরে যায়। এভাবে পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীই নিজস্ব বাসস্থান ব্যতীত স্বাধীনভাবে চলতে পারে না। পৃথিবীকে সুন্দরভাবে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রতিটি প্রাণীর আপন আপন পরিবেশের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান এবং প্রতিটি প্রাণী পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে অনেক সুন্দর জিনিসও অসুন্দর হয়ে যায়। তাই প্রতিটি প্রাণীকে তার নিজ নিজ পরিবেশে বিকাশের সুযোগ দেওয়া উচিত

 

বৈরাগ্য-সাধনে মুক্তি, সে আমার নয় অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময় লভিব মুক্তির স্বাদ

 

মূলভাব : মানুষ সামাজিক জীব সংসার ত্যাগ করে মানুষ কখনও সুখী হতে পারে না সমাজ সংসারের সকলকে নিয়েই মানুষকে সুখী হতে হয়

সম্প্রসারিত ভাব : সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না নিয়েই মানুষের জীবন। একজন মানুষের সাফল্য তখনই আনন্দদায়ক হয় যখন তাতে সকলের অংশগ্রহণ থাকে। পৃথিবীতে কেউই পরিপূর্ণভাবে সুখী হতে পারে না। জীবনে চলার পথে অনেক বাধা  আসতে পারে। তাই বলে ভেঙ্গে পড়া উচিত নয়। সমাজে এক শ্রেণির মানুষ আছে যার দুঃখ-কষ্টকে ভয় পায়। তারা মনে করে সংসার হল একটি বিষাদময় স্থান। সংসারের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার উত্তম উপায় হল সংসার ধর্ম ত্যাগ করা। কিন্তু বৈরাগ্য সাধন করলেই মুক্তি মেলে না। কোনো কিছুই সহজে পাওয়া যায় না। মানুষ তা জানলেও বুঝতে চায় না। সুখ-দুঃখ একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ মাত্র। কষ্টের পরই সুখ আসে যে সুখ বিনাকষ্টে অর্জিত হয় তা স্থায়ী হয় না।  সংসারের সকলের সাথে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেওয়ার মাধ্যমেই মানুষ প্রকৃত মুক্তির স্বাদ উপলব্ধি করে। অন্যদিকে দুঃখ-কষ্ট থেকে বাঁচতে যারা সংসার ত্যাগ করে তারা কখনো মুক্তির সন্ধান পায় না

 

যত বড় হোক ইন্দ্রধনু
সে সুদূর আকাশে আঁকা
আমি ভালবাসি মোর ধরণীর প্রজাপতিটির পাখা

 

মূলভাবঅধরা কিছু পাওয়ার দুরাশা না করে হাতের কাছে যা আছে তা নিয়েই খুশি থাকা উত্তম। কারণ বাস্তব আর কল্পনার মাঝে রয়েছে বিশাল ব্যবধান। তাই প্রতিটি মানুষেরই উচিত আকাশ কুসুম কল্পনা না করে, সাধ সাধ্যের মধ্যে সংগতি বজায় রেখে পথ চলা

সম্প্রসারিত ভাব : মানুষ রূপ বৈচিত্র্যে ভরা মাটির পৃথিবীর সন্তান। প্রকৃতির নদী-নালা, লতা-পাতা, ফুল-ফল, পাখি এসব নিয়েই তার পরিবেশ। এখানেই তার অভ্যস্ত জীবনযাত্রা অব্যাহত গতিতে এগিয়ে চলছে। কিন্তু মানুষ স্বপ্ন বিলাসীও। অধরার সৌন্দর্যকে নিয়ে তার কল্পনা-বিলাসের অন্ত নেই। দূরের আকাশে সাতরঙের বিচিত্র ছটায় ইন্দ্রধনু দেখা যায়। তার সৌন্দর্য মানুষের স্বপ্নচারী মনকে হাতছানি দেয়। কিন্তু যা ধরা- ছোঁয়ার বাইরে তা যত বড়ো বা যত সুন্দরই হোক না তা মানুষের স্পর্শের বাইরে। তার চেয়ে আকর্ষণীয় প্রতিদিনের এই চিরপরিচিত ধূলিমাখা পৃথিবী। কারণ অনেক দূরের বস্তু যতই মনোমুগ্ধকর হোক না কেন, বাস্তবজীবনের সাথে তার কোনো যোগ নেই। তাকে কখনোই আপন করে পাওয়া যায় না। অন্যদিকে, ছোট প্রজাপতি তার বিচিত্র রঙের পাখা নিযে মানুষের চার পাশে উড়ে বেড়ায়। মানুষ সহজেই খুব কাছ থেকে তার সৌন্দর্য উপভোগ করে। মনে হয় অপরূপ সৌন্দর্যের আধার এই প্রজাপতি। তাই মানুষ দূরের রংধনুর সৌন্দর্যের চেয়ে প্রজাপতির সৌন্দর্যে বেশি মুগ্ধ হয়, ভালোবাসে সে তার গৃহের নিকটে ফুটে থাকা নানান বর্ণের ফুল, ভোরের শিশির বিন্দু আর পাখির কলকাকলি। যেন প্রকৃতি-জননীর নিজের হাতে সাজিয়ে রাখা অন্তহীন সৌন্দর্য। প্রকৃত সৌন্দর্য প্রেমিকরা অলীক সৌন্দর্যের মিথ্যা মায়ায় ডুবে থাকে না। বরং ভালোবাসে চারপাশের বিশ্ব প্রকৃতির সৌন্দর্যকে। আর তারাই তো সৌন্দর্যের সত্যিকার সাধক

 

 

সকলের তরে সকলে আমরা
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে

মূলভাব : কেবল নিজের স্বার্থরক্ষাই মানব জীবনের লক্ষ্য নয়। পরস্পর পরস্পরের কল্যাণে উপকারের মাধ্যমেই গড়ে উঠেছে মানব সভ্যতা। পারস্পরিক সহযোগিতা সহমর্মিতাই মানব জাতির সমাজ বন্ধনের ভিত্তি। পথেই মানুষ পায় বাঁচার আনন্দ, অর্জন করে জীবনের সার্থকতা

সম্প্রসারিত ভাব : প্রাণীজগতে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ- মানুষ কেবল নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত নয়। অন্যান্য প্রাণীর মতো কেবল নিজের প্রাণ বংশ রক্ষাতেই সে ব্যাপৃত থাকে না, সমাজ-সভ্যতার অগ্রগতিতেও তাকে ভূমিকা রাখতে হয়। তার জীবন সমাজের সঙ্গে অচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা। সমাজ জীবনই ব্যক্তিমানুষের জীবনকে নিশ্চিন্ত, নিরাপদ, সুগম উন্নয়নমুখী করার নিশ্চয়তা দেয়। তাই সমাজবদ্ধ প্রতিটি মানুষ যদি সমাজের বৃহত্তর কল্যাণের জন্যে নিজ নিজ সামর্থ্য যোগ্যতা অনুসারে মেধা শ্রম না দেয় তবে সমাজের অগ্রগতি ব্যাহত হয় এবং তা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির জীবনেও সংকট বয়ে আনে। সমাজে অবশ্য এমন কিছু আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর লোক আছেন যাঁরা বৃহত্তর সমাজের কাছে তাঁদের অপরিসীম ঋণের কথা ভুলে যান। সমাজ যে মানুষের নিরাপত্তা, শান্তি-শৃঙ্খলা, সুখ-সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে, বিপদে-আপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় সত্য তাঁদের মনে থাকে না। এঁদের ধরনের স্বার্থান্ধ মনোবৃত্তি সমাজের স্বার্থের বিরোধী। এঁরা কেবল যে সমাজের প্রতি দায়িত্বের কথা ভূলে যায় তা নয়, সমাজ বিচ্ছিন্নও হয়ে পড়ে। এঁদের জীবন অনেকটা গুটি বা খোলসের ভেতরে আবদ্ধ রেশম পোকার জীবনের মতোই বৃত্তবদ্ধ। জীবন টিকে থাকর মতো জীবন, বাঁচার মতো বাঁচা নয়। বস্তুত মানুষ সবার সঙ্গে সবার মধ্যে সবার জন্যে বাঁচে। সে বাঁচাই যথার্থ বাঁচা। যে সমাজ মানুষকে দেয় অনেক সেই সাজের জন্যে কিছু করতে পারলে জীবন কেবল সার্থক হয় না, পরের কল্যাণে আত্মত্যাগের অপরিসীম আনন্দে জীবন স্নিগ্ধ হয়। পরস্পরের মঙ্গলের চেষ্টাতেই সমাজের কল্যাণ হয়, মানুষের জীবন হয় সার্থক

 

অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে

 

সুন্দর সমাজ গড়ার জন্য এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য মানুষ গড়ে তুলেছে অনুশাসন এবং ন্যায়-নীতির মানদন্ড। কিন্তু কিছু মানুষ রয়েছে যারা এসব ন্যায়-নীতি অমান্য করে অন্যায় অবৈধ কর্মতৎপরতায় লিপ্ত হয়। এরা সমাজের চোখে অন্যায়কারী এবং আইনের চোখে অপরাধী হিসাবে বিবেচিত। আবার যারা অন্যায়ের প্রতিবিধান বা বিরুদ্ধাচরণ করে না বরং শৈথিল্যের সাথে তা মেনে নেয়, সূক্ষ্ম বিচারে তারাও অপরাধী। কারণ অন্যায়ের বিচার না করলে তা প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে। আমরা জানি ক্ষমা একটি মহৎ গুণ। হিসাবে অপরাধীকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা যেতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে এমনটি মনে হলেও মনে রাখা দরকার যে, ক্ষমারও নির্দিষ্ট সীমা থাকতে হবে। তা না হলে অন্যায় বেড়ে গিয়ে সমাজ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। বিবেকবান মানুষ হিসাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার চেতনার অধিকারী হলেও অনেক সময় মানুষ নানা কারণে দিনের পর দিন অন্যায়কে সহ্য করে। সরাসরি অন্যায় না হলেও এটি অন্যায়কে সহযোগিতা করার নামান্তর। অনেকে বিপদের ঝুঁকি থাকায় নীরবে অন্যায়কে সহ্য করে চলে। এসব প্রবণতার কারণে আজ আমাদের সমাজে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে অন্যায়কারী এবং অন্যায় সহ্যকারী উভয়ই সম অপরাধে অপরাধী

কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে
দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহিতে?

মূলভাব : জীবনে চলার পথে বাধা বিঘ্নকে ভয় করে পিছিয়ে পড়লে জীবনে সফলতা অর্জন করা যায় না। জীবনকে সাফল্যমন্ডিত করতে হলে সকল দুঃখ-কষ্ট, বাধা-বিঘ্ন জয় করে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ কষ্টের মাধ্যমে অর্জিত সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়

দুঃখকে বাদ দিয়ে জীবনে সুখের আশা করা যায় না। পদ্মকে তুলতে গিয়ে কাঁটার ভয় করলে চলবে না। কাঁটার ভয়ে বা কাঁটার আঘাতে যদি কেউ পদ্ম তুলতে না যায়, তাহলে তার পক্ষে পদ্ম আহরণ সম্ভব হবে না। তেমনি একটিকে চাইতে গেলে অপরটিকে মেনে নিতে হয়। ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ জয়-পরাজয় ইত্যাদি নিয়েই আমাদের জীবন। একটি অপরটির পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। দুঃখকে বাদ দিলে জীবনে সুখের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। দুঃখের মধ্য দিয়েই জীবনে সুখের আস্বাদ লাভ করা যায়। দুঃখের ভয়ে যে তার নিজ কর্ম থেকে বিরত থাকে তার পক্ষে সুখ লাভ করা সম্ভব নয়। সফলতার পথ কণ্টকাকীর্ণ। এই কাঁটার ভয়ে যে সেই পথে হাঁটে না সে কখনো সফল হয় না। দুঃখ-যন্ত্রণা, পরিশ্রম, ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়েই মানুষ তার গন্তব্যে পৌঁছায়। আর যারা দুঃখ-যন্ত্রণা, ক্লান্তির ভয়ে ভীত হয় তারা সহজেই ঝরে পড়ে সাফল্যের পথ থেকে। তাই সকল প্রতিকূলতাকে বরণ করেই মানুষকে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে। পৃথিবীতে যাঁরা বড় হয়েছেন, সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেছেন তাঁরা সবাই সাধনার দ্বারা দুঃখ-কষ্ট, বাধা-বিঘ্নকে অতিক্রম করেই হয়েছেন। পরাজয়ের গ্লানি, পরিশ্রমের কষ্টকে জয় করার মাধ্যমেই সফলতা অর্জন করা সম্ভব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন- “ব্যর্থতাই মানুষের জীবনের প্রথম সাফল্য।

 

শৈবাল দীঘিরে বলে উচ্চ করি শির
লিখে রেখো এক ফোঁটা দিলেম শিশির

 

মূলভাব : মহৎ তারাই যারা মিথ্যে বাহাদুরির আশ্রয় নেন না। পরের কল্যাণ সাধনেই তাদের সুখ। আর অকৃতজ্ঞ ব্যক্তি সমাজের কাছে সব সময়ই মূল্যহীন। তারা কখনোই সমাজে বড় কিছু হতে পারে না

সম্প্রসারিত ভাব : মহৎ মানুষ হিংসা, দীনতা, হীনতা স্বার্থপরতা থেকে নিজেকে দূরে রাখেন। উদার, মানব প্রেমিক এসব মানুষ সর্বদা সকল মানুষের মঙ্গল চিন্তা করেন। তাদের জ্ঞান-প্রজ্ঞা কর্ম দিয়ে দেশ জাতির কল্যাণসাধন করেন। তারা কখনো আপন গৌরবের কথা, উপকারের কথা অন্যের কাছে গর্ব করে প্রচার করেন না। সমাজের মানুষকে তারা বটবৃক্ষ হয়ে আগলে রাখেন। তারা নিঃস্বার্থভাবে অপরের জন্য কাজ করে যান। বিপরীতে আমাদের সমাজে কিছু হীন, স্বার্থপর মানুষ আছে যারা সর্বক্ষণ নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। অন্যের উপকারের কথা স্বীকার করতে চায় না। বরং কখনো যদি উপকারীর সামান্যতম উপকার করতে পারে, তবে তা অতিরঞ্জিত করে প্রচার করে। তারা কখনোই বুঝতে চেষ্টা করে না যে তারা কতটা ক্ষুদ্রমনা। এই অকৃতজ্ঞতাবোধের পরিচয় পাওয়া যায় শৈবালের জীবনে। শৈবালের জন্ম দীঘির জলে, দীঘির জলেই তার অবস্থান। দীঘি তাকে পরম মমতায় তার জলে স্থান দেয়। সেই জলেই শৈবালের বেড়ে ওঠা। শৈবালের উচিত দীঘির প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া। কিন্তু তা না করে মিথ্যে বাহাদুরি দেখায়। কেননা, শৈবালের ডগায় রাতের শিশির বিন্দু জমে। এক সময় তা দীঘির জলে পড়ে। অকৃতজ্ঞ শৈবাল তখন অহংকার করে এই বলে যে, সে দীঘিকে এক ফোঁটা জল দিয়েছে। তার এই এক ফোঁটা জল নিতান্তই তুচ্ছ যা দীঘির তেমন কোনো উপকারে আসে না। বরং এতে শৈবালের হীনমন্যতার পরিচয় পাওয়া যায়। আমাদের সমাজের অকৃতজ্ঞ মানুষগুলোও শৈবালের মতোই

 

ভাবসম্প্রসারন: পৃথিবী অলস ভীরু কাপুরুষদের জন্য নয়

মূলভাব : পৃথিবীতে তারাই টিকে থাকে, যারা পরিশ্রমী, সাহসী, উদ্যমী এবং সংগ্রাম করে সব প্রতিকূলতাকে জয় করতে পারে

ভাব-সম্প্রসারণ : পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী বস্তু কণাকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয়। একখণ্ড পাথর পৃথিবীর একটু অবস্থান হয়তাে দখল করে আছে। তাকে সরাতে চাইলে সে সহজে নড়ে না। প্রাণপণে আঁকড়ে থাকে স্থানটুকুতে। যতক্ষণ পর্যন্ত তার চেয়ে অধিক শক্তি প্রয়ােগ করা না যায় ততক্ষণ সে সেই স্থান ছাড়ে না। একটি তৃণলতা মাটি আঁকড়ে ধরে টিকে থাকে। তাকে উপড়ে ফেলতে চাইলে সে প্রাণপণে মাটিকে কামড়ে ধরে। যতক্ষণ তার চেয়ে বেশি শক্তি প্রয়ােগ করা না হয়, ততক্ষণ সে উঠে আসে না। হচ্ছে টিকে থাকার সংগ্রাম। মানবসমাজে সংগ্রামের রূপ আরাে তীব্র প্রতিযােগিতাপূর্ণ। এখানে জন্মের পর থেকে প্রতিটি মানুষকে টিকে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়, পরিশ্রম করতে হয়। পরিশ্রম ছাড়া পৃথিবীতে কোনাে কিছুই লাভ করা যায় না। আজকের মানব সভ্যতার যে উন্নতি, এর মূলে রয়েছে মানুষের নিরলস কর্ম প্রচেষ্টা, সাধনা নিরন্তর পরিশ্রম। যারা পরিশ্রম করতে জানে, তারাই পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারে। আজকে আমরা যাদেরকে সমাজের, জাতির বা বিশ্বের নেতৃত্ব দিতে দেখি তাদের এই শীর্ষস্থানে উঠে আসার মূল চাবিকাঠি হচ্ছে পরিশ্রম। তারা দুর্জয় সাহসে, নির্ভিকচিত্তে সংগ্রাম করেছে, প্রতিকূলতাকে জয় করেছে। ফলে আজ তারা বিশ্বের চালিকা শক্তি হতে পেরেছে। ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই। পৃথিবীর ইতিহাসে তাঁদেরই নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে- যারা দুর্জয় সাহসে জীবন-মরণ পণ করে কর্মক্ষেত্রে ঝাপিয়ে পড়েছে এবং সব বাধা-বিপত্তিকে পায়ে দলে সাফল্যকে ছিনিয়ে এনেছে। যেমন : আলেকজান্ডার বা নেপােলিয়নের মতাে বীরযােদ্ধা, এরিস্টটল, সক্রেটিস, প্লেটোর মতাে মহাজ্ঞানী, হযরত মুহম্মদ ()-এর মতাে মানব মুক্তির দিশারি, শেক্সপীয়র, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের মতাে কবি-সাহিত্যিক প্রমুখ। আজকে তারা প্রতিটি মানুষের কাছে স্মরণীয় বরণীয়। ইতিহাস তাঁদেরকে কখনাে ভুলে যাবে না। কিন্তু যারা অলস, ভীরু, কাপুরুষ, তারা কোনােভাবেই পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারবে না। পৃথিবী তাদের জন্য নয়। অলসরা জীবনে কোনােকিছুই করতে পারে না। তারা সবসময় থাকে নির্ভরশীল। আর যারা ভীরু, কাপুরুষ তারা তাে মরার আগেই মরে থাকে। নতুন পথে পা বাড়ানাে তাে দূরের কথা, প্রচলিত পথেই তারা পা বাড়ানাের সাহস পায়। ফলে জীবনে তারা কোনাে কিছুই অর্জন করতে পারে না। তারা খুব দ্রুত হারিয়ে যায়। মানুষ তাদেরকে মনে রাখে না। পৃথিবীর ইতিহাসে তাদের নামের ছায়াটুকুও থাকে না কারণ টিকে থাকতে হলে প্রয়ােজন পরিশ্রম সাহস। পৃথিবী অলস, ভীরু কাপুরুষদের জন্য নয়

মন্তব্য: পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে চাই কঠোর পরিশ্রম সাহসী সাধনা। কিন্তু ভীরু, অলস, কাপুরুষদের দ্বারা তা সমভব হয় না। আর সেজন্যই বলা হয় যে, পৃথিবী অলস ভীরু কাপুরুষদের জন্য নয়

 

আলাে বলে, “অন্ধকার, তুই বড় কালাে”। অন্ধকার বলে, “ভাই, তাই তুমি আলাে।”

মূলভাব : আলাে-আঁধার, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না এসব পরপর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। এদের একটি ছাড়া যেমন অন্যটির অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না, তেমনি তার সার্থকতাও আশা করা অনুচিত। এ বৈপরীত্য নিয়েই জীবন।

ভাব-সম্প্রসারণ : আমাদের এ সুন্দর পৃথিবীতে পরস্পর বিপরীতধর্মী উপাদানসমূহের প্রক্রিয়া সচল । মূলত বৈচিত্র্যের অপূর্ব সমাবেশেই জীবন ও জগৎ গড়ে উঠেছে। দুঃখ আছে বলেই সুখ এমন মহিমান্বিত, আর সুখ আছে বলেই মানুষ দুঃখকে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। জন্মের পর মৃত্যু অবধারিত বলেই জীবনকে বলা হয় মহামূল্যবান । অন্ধকার এসে দিবালােক গ্রাস করে বলেই পরদিন প্রভাতের সােনালি সূর্যোদয় চিত্তকে হরণ করে ।

আঁধার আছে বলেই আলাে বৈচিত্র্যময়, বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। অতৃপ্তি না থাকলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন হতাে না। মহৎ বেদনা না থাকলে মহৎ কাব্য কোনােদিন সৃষ্টি হতে পারত না। এটিই সবচেয়ে বড় সত্য । সুতরাং অন্ধকার
থেকে মুক্তির আশায় আলাের সন্ধান করতে হবে; আনন্দকে সঠিক উপলব্ধির জন্য বেদনাকে জয় করতে হবে। কারণ আলাে-আঁধারের, সুখ-দুঃখের অবস্থান পাশাপাশি । এসবের মােকাবেলার মাধ্যমেই জীবন হৰে সুখী, ও সার্থক।

মন্তব্য : জগতে যদি বৈচিত্র্য না থাকত তাহলে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ইত্যাদি অনুভূতির কোনাে অস্তিত্বই থাকত না। তাই এ জগতে কোনােকিছুই তুচ্ছ ও মূল্যহীন নয়।

 

বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি
 চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী,
 অর্ধেক তার নর।
মূলভাব : নারীরা সমাজেরই অর্ধাংশ। নারীকে বাদ দিয়ে সমাজের সার্বিক কল্যাণ বা অগ্রগতি সম্ভব নয়। কেননা আদর্শ সমাজ রচনায় নারী ও পুরুষ একে অপরের সহকর্মী।

ভাব-সম্প্রসারণ : পৃথিবী নামক যানের দুটি চাকা। তা হলাে- নর ও নারী। এর একটিকে বাদ দিলে যানটি চলার অযােগ্য হয়ে পড়বে-এটাই সত্য। আর এ দুই চাকা বিশিষ্ট যান সুদীর্ঘকাল ধরে সভ্যতার পথে এগিয়ে চলছে। মূলত পৃথিবীর এ রূপ-সৌন্দর্য, নানা রকম ঐশ্বর্য ও সম্পদের পূর্ণতার পেছনে মানবজাতির দুই শ্রেণিরই অবদান রয়েছে। অথচ এ পৃথিবীর পুরুষেরা তা মানতে নারাজ। ফলে পুরুষশাসিত এ সমাজে সর্বক্ষেত্রে নারীরা হচ্ছে অবহেলিত।

কোনাে কোনাে সমাজে নারীরা ঘরের বাইরেও বের হতে পারে না। স্বাভাবিক
জীবন যাপন তাদের জন্য নিষিদ্ধ। এ সামাজিক বৈষম্যের অবসান হওয়া দরকার । পুরুষ তার পেশিশক্তি, আকার-আকৃতি আর সমাজশক্তির জোরে পৃথিবী শাসন করবে তা হতে পারে না। তাই আজ নারীর যথার্থ মূল্যায়ন করতে হবে। বর্তমানে সমাজের প্রতিক্ষেত্রে নারীদের অবাধ বিচরণ। নারী ছাড়া পুরুষ বিকলাঙ্গও বটে। তাই নারীকে তার মর্যাদার স্বীকৃতি দিতে হবে। শুধু কথায় নয়, আইন করে তাদের দিতে হবে। সম-অধিকারের মর্যাদা। তাহলেই পৃথিবী এতদিনের অভিশাপমুক্ত হবে।

পৃথিবী অলস ভীরু কাপুরুষদের জন্য নয়

মন্তব্য: পৃথিবীর যাবতীয় মহান সৃষ্টির পেছনে নারীর সেবা, যত্ন ও সাধনা বিদ্যমান। তাই নারীকে সম্মান করা আমাদের সবার কর্তব্য।
 
আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যে বা আমি বাঁধি তার ঘর, আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মােরে করেছে পর।
 
মূলভাব: অসাধারণ প্রীতি ও অকুণ্ঠ ভালােবাসা দিয়ে সব মানুষের হৃদয় জয় করতে পারাই সত্যিকার মনুষ্যত্ব।

সম্প্রসারিত ভাব: সহনশীলতা, মমতা ও ভালােবাসা মানুষকে মহৎ করে। মানুষের মাঝে মনুষ্যত্ববােধ জাগ্রত করে। সহা
 
 
নুভূতিশীল হয়ে মানুষের উপকার করার মধ্যেই সত্যিকারের মনুষ্যত্ব প্রকাশিত। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিহিংসা পরিহার করে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। কবির দুর্বলতার সুযােগে অনেকেই তাকে ব্যথা দিয়েছে। সে কবির প্রিয়জনকে কেড়ে নিয়ে কবির হৃদয়ে শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। কিন্তু কবি কোনাে বিরূপ প্রতিক্রিয়া না করে তাকে আপন করে পাওয়ার জন্য ব্রতী হয়েছেন। যে যেভাবেই তার প্রতি শত্রুতা করতে প্রয়াসী হােক না কেন, প্রতিদানে তিনি দেবেন মমতা ও ভালােবাসা, ধারণ করবেন অসীম সহনশীলতা। কেউ যদি কবির ঘর ভেঙে দেয়, তাকে ঘর ছাড়া করে, প্রতিদানে তিনি তার ঘর বাঁধার কাজে ব্রতী হবেন। তাকে আপন করে পাওয়ার জন্য পথে পথে ঘুরবেন। কেউ যদি তার ক্ষতি করে, তার প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করে কিংবা কঠিন আঘাতে অন্তর জর্জরিত করে, কবি তাতে একটুও রাগ করবেন না। প্রতিদানে তিনি কাটার বদলে দেবেন ফুলের মালা। সকল শত্রুতা, হিংসা-দ্বেষ ও নিষ্ঠুরতাকে তিনি জয় করবেন মমতা, ভালােবাসা দিয়ে। যে যতই বিমুখ হােক, তার প্রাণে যতই আঘাত দিক না কেন, তিনি নির্দ্বিধায় তা সহ্য করবেন। যে ব্যক্তি আঘাতের প্রতিঘাত হানে না, তার মধ্যে রয়েছে অসীম ধৈর্য। যে শত্রুকে বুকে টেনে নেয়, সেই প্রকৃত মানুষ, মানবতার মুকুট।

মন্তব্য: সহনশীলতা, মমতা, ভালােবাসার মাধ্যমেই সমাজের প্রকৃত উন্নতি সম্ব। এটিই হওয়া উচিত আমাদের মূলমন্ত্র।
 
 
                                                             নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস
ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস।
নদীর ওপার বসি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে;
কহে, যাহা কিছু সুখ সকলি ওপারে
অথবা, নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস ভাবসম্প্রসারণ

 মূলভাব ; পার্থিব জীবনে কোনাে মানুষই নিজের বর্তমান অবস্থায় সুখী নয়। প্রত্যেকেই অপরকে সুখী ভেবে নিজের কষ্ট বাড়ায়।


ভাব-সম্প্রসারণ : দৃশ্যমান জগৎ সংসারে প্রতিটি মানুষ নিরত্র সুখের সন্ধানে ব্যস্ত। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা তাই অহীন। প্রকৃত সুখের সন্ধান কেউ পায় না। নদীর এপার ভাবে-ওপারই সর্বাধিক সুখী। আবার নদীর ওপার ভাবে-এপারেই রয়েছে সুখের সমুদয় উপাদান। সংসারে একজন ভাবে তার মতাে দুঃখী আর কেউ নেই। অথচ প্রকৃত বিচারে তার গ্রহণযােগ্যতা খুবই অল্প। কেননা মানুষের অফুরন্ত চাহিদাই তাকে দুঃখী করে। আর মানুষের আকাঙক্ষা করার ক্ষমতা অসীম, কিন্ত তাকে রূপদানের ক্ষমতা তার সীমিত। তাই সে
আকাক্ষা করে প্রচুর, কিন্ত পায় তার সামান্য ভগ্নাংশ মাত্র। এটাই তার চিরন্তন অতৃপ্তির কারণ। বাস্তবিক, আমরা যা কিছু চাই তা পাই  আর যা কিছু পাই তা চাই না। সােনার হরিণের সন্ধানে অন্ধ আবেগে আমরা তার পশ্চাৎ ধাবন করতে পারি মাত্র, কিন্ত তার নাগাল কোনােদিনই পাই না। এভাবে পার্থিব সুখ অন্বেষণে ক্লান্ত হয়ে মানুষ চিরকাল শুধু অসম্ভবের পদতলে মাথা কুটে মরে।

মন্তব্য : মানবজীবন চিরকাল সুখ-শান্তিতে কাটে না। আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। চাওয়া- পাওয়ার গডি তাই মাটির কাছাকাছি হওয়াই ভালাে।

রাত যত গভীর হয় প্রভাত তত নিকটে আসে 

মূলভাব : দুঃখের পর সুখ আসে, এটিই জগতের নিয়ম। বরং দুঃখ যত বেশি হবে তত দ্রুত সুখের আগমন ঘটবে। কেননা একের শেষেই অন্যের আবির্ভাব।

ভাব-সম্প্রসারণ : সৃষ্টিকর্তার এ পৃথিবীতে সবকিছুই চলছে নিয়মের মাধ্যমে। এখানে সবকিছুই পর্যায়ক্রমে আসে। মানবজীবনে সুখ-দুঃখও তেমনি একটি বিষয়। জীবনে সুখ-দুঃখ কারাে চিরস্থায়ী নয়। সুখের দিন যত ফুরিয়ে আসে দুঃখের রাত ততই নিকটবর্তী হয়। আবার
রাত যত গভীর হয় সুখের প্রভাত তত কাছে আসে। এটিই জীবনের ধর্ম। ইংরেজিতে একটি কথা আছে-Adversity often leads to prosperity. অর্থাৎ দুঃখের পরিণতি সুখ। এ জীবনে দুঃখ-কষ্টকে দেখে হতাশ হবার কিছু নেই। মনে রাখতে হবে আজ যারা সুখের স্বর্গে বাস করছে, তাদের সুখ একদিনে আসে নি। হাজারাে উত্থান-পতনের মাধ্যমে এর আগমন। তাই আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে, ধৈর্য ধরতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, দুঃখ-কষ্টের প্রবহমান স্রোতই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায় সুখ-সমৃদ্ধির পথে ।

মন্তব্য : রাত যত গভীর হয় ততই তা দিনের সান্নিধ্যে আসে-এটিই প্রকৃতির নিয়ম। সুতরাং হতাশার চাদর ফেলে দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলাতেই জীবনের সার্থকতা।
 
 

পাপকে ঘৃণা কর পাপীকে নয়

 মূলভাব; মানুষ জন্মের সময় নিস্পাপ হয়েই জন্মগ্রহণ করে। পরবর্তীতে চলমান সমাজজীবনের পাল্লায় পড়ে নিজের অজ্ঞাতেই একদিন সে পাপ কাজে জড়িয়ে পড়ে। তাই পাপীকে ঘৃণা না করে সবারই পাপকে ঘৃণা করা উচিত।

ভাব-সম্প্রসারণ ; মানুষ সৃষ্টিকুলের শ্রেষ্ঠ জীব। মানুষ যখন পৃথিবীতে আসে তখন সে থাকে নিস্পাপ। ক্রমশ সে বড় হতে থাকে। একসময় সে জিবনের তাগিদে অর্থের প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করে এবং বিভিন্ন কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। কিন্ত তার এ চলার পথে নিজের অজান্তেই কিংবা সার্বিক পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রেই তাকে ধাবিত করে অন্যায় পথে। ফলে সে হয় পাপী। অথচ সে 'পাপী' হয়ে জন্মায় নি। আমাদের সমাজে এরূপ অসংখ্য পাপীর সন্ধান পাওয়া যায়। তাদের জীবন ইতিহাস পর্যালােচনা করলে দেখা যায় যে, তাদের 'পাপী' হওয়ার পেছনে যথেষ্ট কারণ আছে। আমরাই তাদেরকে পাপী হতে বাধ্য করছি। অথচ আমরা তাদের সঠিক পথে আনার চেষ্টা না করে আরাে অবহেলা করি। এটি মােটেও ঠিক নয়। অনুকূল পরিবেশ আর মায়া-মমতায় পাপীরাও চায় সুন্দরভাবে বাঁচতে । আর আমরা সে সুযােগ না দিয়ে উল্টো পাপীদের এড়িয়ে চলি। আমাদের এ ধরনের মানসিকতা একজন পাপীর সংশােধনের অন্তরায়। এর ফলে পাপের মাত্রা আরাে বেড়ে যায়। পাপী অবহেলিত হলে সাধারণের প্রতি তার মনের ক্ষোভ আরাে বেড়ে যায়। কাজেই পাপীকে ঘৃণা করা উচিত নয়।

মন্তব্য ; আমাদের সবাইকে এ সমাজ গঠনে এগিয়ে আসতে হবে। সুন্দর সমাজ গঠনের জন্য পাপীকে বুকে টানতে হবে। আর পাপকে ঘৃনা করতে হবে।

প্রাণ থাকলেই প্রাণী হয় কিন্তু মন না থাকলে মানুষ হয় না

 ভাব সম্প্রসারণ: প্রাণ থাকলে প্রাণী হয়, কিন্তু মন না থাকলে মানুষ হয় না।
অথবা, তরুলতা সহজেই তরুলতা, পশুপাখি সহজেই পশুপাখি কিন্তু মানুষ প্রাণপণ চেষ্টায় তবে মানুষ।
 
 মূলভাব : প্রাণ থাকলেই মানুষকে প্রকৃত মানুষ বলা যায় না। মানুষ নামের যােগ্য হতে হলে তাকে হতে হবে বড় মনের অধিকারী।
ভাব-সম্প্রসারণ : যাদের প্রাণ আছে তাদের প্রাণী বলা হয়। পৃথিবীতে অসংখ্য প্রাণীর মধ্যে মানুষও এক শ্রেণির প্রাণী। প্রাণের দিক দিয়ে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে কোনাে তফাৎ নেই। মানুষের এমন কতকগুলাে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে যা মানুষকে অন্য প্রাণী থেকে পৃথক করেছে। আর এজন্যই মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত' অর্থাৎ সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষের এ শ্রেষ্ঠত্বের কারণ হচ্ছে তার বিবেক। মনের বিকাশের মাধ্যমেই মানুষ মহৎ গুণাবলি অর্জন করতে পারে এবং ভালাে-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা করতে পারে। আর এ জন্যই সেবা,
সত্যনিষ্ঠা, ধৈর্য, তিতিক্ষা ইত্যাদি গুণাবলির সমন্বয়ে গড়ে ওঠে মানুষের জীবন। সুন্দর মন এসব গুণাবলির ধারক ও বাহক। মানুষের মধ্যে এ সুন্দর মন নিহিত থাকার জন্যই মানুষ নিজের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে অন্যের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করে। শুধু তাই নয়, শান্তি ও মৈত্রীর কথা ভেবে মানুষ বিশ্বভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। অপর দিকে মনহীন প্রাণী, তারা প্রাকৃতিক নিয়মে জন্মগ্রহণ করে ও পূর্ণতা পায়। বলাবাহুল্য তারা এ পূর্ণতার জন্যে যত্ন বা সাধনায় ত্যাগ স্বীকার করে না। তাই তারা প্রাণী, অথচ মানুষের ক্ষেত্রে ঠিক এর বিপরীত। কেবল আকৃতিতে মানুষ হলেই তাকে মানুষ বলা যায় না। তাদের মধ্যে মনুষ্যত্ব থাকতে হয়। তাই সব মানুষ প্রাণী কিন্তু সব প্রাণী মানুষ নয়। কারণ সব প্রাণীর প্রাণ আছে বটে কিন্তু মন নেই। কাজেই বলা যায়, কেবল প্রাণ নয়, মনই মানুষকে মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী করে তােলে।
মন্তব্য: মন মানুষকে পশুত্ব থেকে মনুষ্যত্বে উন্নীত করে। মানুষ হতে হলে সুন্দর মনের অধিকারী হতে হবে।

মঙ্গল করিবার শক্তিই ধন, বিলাস ধন নহে

 

মূলভাব : মানব কল্যাণে ব্যয়িত ধনই প্রকৃত ধন, বিলাসিতা বা অপ্রয়ােজনে ব্যয়িত ধন প্রকৃত ধন নয়।

 ভাব-সম্প্রসারণ: ধন-সম্পদ মহান আল্লাহ্ তা'আলার দান। আল্লাহ্ তা'আলা এ পৃথিবীতে মানবজাতি প্রেরণ করেছেন এবং তাদের জীবনকে আরামপ্রদ করে তােলার নিমিত্তে ধন-সম্পদ দান করেছেন। মানুষ সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে শ্রমের বিনিময়ে অর্থ উপার্জন করে। কিন্তু এর সার্বিক ব্যবহার না জানলে তা ধনী-গরিব সব ব্যক্তির জন্য এক মহা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পৃথিবীর প্রায় অধিকাংশ ধনবান ব্যক্তিই বিলাসিতায় অর্থ ব্যয় করে থাকে। কিন্তু এ বৃহৎ সমাজ ও রাষ্ট্রের অগণিত আর্ত পীড়িত মানুষের মুখগুলাে তাদের দিকে চেয়ে থাকে একমুঠো অন্নের আশায়। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হয় যে, ধনীরা গরিবদেরকে সাহায্য করা তাে দূরের কথা অপমানিত করতেও দ্বিধাবােধ করে না। কিন্তু তারা জানে না, নিজ জীবনের কামনা-বাসনাকে বড় করে দেখে, আরাম আয়েশের দিকে লক্ষ্য রেখে যারা সম্পদের পাহাড় গড়ে, তারা প্রকৃত ধনে ধনী নয়। মূলত দরিদ্রের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া তথা আর্তের মঙ্গল করার মাঝেই ধনের প্রকৃত ব্যবহার নিহিত। মানুষ ধনার্জন করে, ধনের পাহাড় গড়ে তােলে, কিন্তু ধনের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারে না।
আল্লাহ পৃথিবীর সবাইকে ধনী বানান নি। এটি তার পরীক্ষা। ধনীদের যে অর্থ সম্পদ রয়েছে তাতে গরিবদেরও অধিকার রয়েছে। সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আছে “তাদের ধন-সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিত লােকদের হক বা অধিকার রয়েছে। সমাজের এতিম, অসহায়, পঙ্গ, সর্বহারাদের জন্য যে ধন ব্যয় হয় না, সে ধনের কোনাে মূল্য নেই। মঙ্গল সাধনে অর্থ ব্যয় করার মধ্যেই প্রকৃত গৌরব নিহিত। দুস্থ মানবতার সেবায় ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারতা সাধনে, ত্যাগের মঙ্গল সাধনে ধন-সম্পদ ব্যয় করা সবার একান্ত কর্তব্য। “যে ধন অন্যের মঙ্গলে ব্যয়িত না হয়ে কেবল বিলাসিতায় ব্যয়িত হয় সে ধনের কোনাে সার্থকতা নেই। নবী করীম (স) বলেছেন, যে নিজে তার পরিবারের সাথে আহার করে অথচ তার প্রতিবেশী পরিবার অভুক্ত থাকে, সে আমার উম্মত নয়।” বিচিত্র পৃথিবীর বৈচিত্র্যময় ভুবনে যারা ফুর্তিতে অর্থ ব্যয় করে, তাদের বিষাক্ত ছােবলে কলুষিত হয় সমাজ আর রাষ্ট্র। যদি অর্থ মানব কল্যাণে ব্যয়িত হয় তবেই তা হয় ধনের সঠিক মূল্যায়ন। তাই আল্লাহ প্রদত্ত ধনকে ব্যক্তিস্বার্থে নয়; বরং সমাজ আর রাষ্ট্রের স্বার্থে ব্যয় করাই একজন প্রকৃত ধনবান ব্যক্তির কর্তব্য।

মন্তব্য: ধন-সম্পদ বিলাসিতায় ব্যবহার না করে তা জনকল্যাণে ব্যবহার করা উচিত।

 

সুজনে সুযশ গায় কুযশ ঢাকিয়া, কুজনে কুরব করে সুরব নাশিয়া

 মূলভাব : 'সু' এবং 'কু' একে অপরের বিপরীত। সাধারণ ভাবে সকল ভাললাকে ‘সু' বলা যায় এবং সকল খারাপকে ‘কু বলা যায়। অনুরূপ ভাবে সুজন ও কুজনের সম্পর্কও বিপরীত। আমাদের সমাজে এই দু’প্রকার লােকেরই অস্তিত্ব রয়েছে। সুজন লােক তারাই যারা অপরের দোষ-ত্রুটি গােপণ করে ভাললাদিক প্রচার করেন। অন্যদিকে, কুজন লােক অপরের ভালাে কাজ গােপন রেখে খারাপ কাজগুলাে প্রচার করে।

ভাব-সম্প্রসারণ : আমাদের সমাজে বিচিত্র রকমের লােকের বসবাস। কোনাে ব্যক্তিকে চেনা যায় তার আচার-আচরণ, ব্যবহার, কথাবার্তা এবং কাজ-কর্মে। সমাজে সুজন লােকের সংখ্যা প্রকৃত ভাবে কম। সুজন ব্যক্তি সবসময় সমাজের ভালাের জন্য কাজ করে যান। অপরের কীভাবে কল্যাণ করা যায় সেই চিন্তায় তিনি নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। সুজন ব্যাক্তি অপরের দোষ-ত্রুটি গােপন রাখেন, প্রচার করেন না। বরং খারাপ ব্যক্তির ভালাে কাজ গুলাে প্রচার ও প্রশংসা করে তাকে ভালাে কাজ করতে উৎসাহিত করেন। একে বলা যায় খারাপ ব্যক্তিকে সংশােধন করার একটি প্রয়াস। প্রকৃত পক্ষে সুজন ব্যক্তি নিজে ভালাে বলেই অপরের ভালাে কাজ দেখতে পারেন এবং অপরের সুন্দর মনের সন্ধান পান। অপর দিকে কুজন বা খারাপ চরিত্রের লােক অপরের ভালাে দেখতে পারে না। তারা নিজেরা শুধু খারাপ কাজ করেই ক্ষান্ত হয় বরং কীভাবে অন্যের ক্ষতি করা যায় সেই চিন্তায় মশগুল থাকে। সে অপরের ভালাে কাজের কথা গােপন রেখে ভালাে কাজকেও খারাপ বলে প্রচার করে। অন্যের চরিত্রের দুর্বল বা নেতিবাচক দিকটি খুঁজে বের করে তা প্রচার করে বেড়ানােই কুজনের কাজ। সে যেহেতু নিজে খারাপ প্রকৃতির তাই অপরের গুণ প্রত্যক্ষ করার তার কাজ নয়। অপরের দোষ ধরা বা ক্ষতি করাই তার ধর্ম। বর্তমান সমাজে কুজনের সংখ্যাগরিষ্ঠতাই বেশি।

ফলে বর্তমান সমাজে এত বিশৃঙ্খলা চোখে পড়ে। সমাজকে তারা অনিবার্য বিপদের দিকে প্রত্যহ ঠেলে দিচ্ছে। সুজন বা মহৎ ব্যক্তিগণ যেখানে সমাজের উন্নয়নকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সেখানে কুজন বা খারাপ চরিত্রের লােকেরা উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে পেছন থেকে টেনে ধরছেন।

মন্তব্য: সমাজে ভালাে ও মন্দ উভয় শ্রেণির লোকই বাস করে। দুর্জন বিদ্বানকে চিহ্নিত করে আমরা যেমন তাদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকি তেমনি সুজন ও কুজনকে আমাদের চিহ্নিত করতে হবে এবং কুজনকে পরিত্যাগ করতে হবে।

পথ পথিকের সৃষ্টি করে না, পথিকই পথের সৃষ্টি করে

 মূলভাব: উক্তিটি রূপক তাৎপর্যে অনুপম। এর আক্ষরিক অর্থ এই যে, আসলে পথ পথিকের সৃষ্টি করতে পারে না, পথিকই পথের সৃষ্টি করে।

ভাব-সম্প্রসারণ: জীবনচক্রে আবর্তনকারী পথিক মহাজীবনের রথ, সে গতির প্রতীক। পথিকের পদচিহ্নে অঙ্কিত হয় পদরেখা। এ ক্ষেত্রে উক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্য পূর্ণ ও অর্থবহ। এ পৃথিবীতে মানুষের পদচিহ্নকে বুকে ধারণ করেই পথের উৎপত্তি হয়েছে। পথিক পথের সৃষ্ট বস্তু নয়। ঠিক একইভাবে মানুষ কখনাে অদৃষ্টের তৈরি বস্তু হতে প&#